বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় তামাকের ফাঁদ ‘ভাইবসিটি’

খুলনায় সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আশেপাশে ‘ভাইবসিটি’ নামে পরিচিত বিশেষ ধরনের দোকান উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে উঠছে। এসব দোকান মূলত জাপান টোবাকো ইন্ডাস্ট্রিজ (জেটিআই)-এর ক্যামেল ব্র্যান্ডকে প্রমোট করার জন্য কোম্পানির পূর্ণ খরচে সাজানো হচ্ছে। দোকানদারদের ফ্রি-তে দোকান ডেকোরেশন, কালার, ফার্নিচার ও প্রমোশনাল সামগ্রী সরবরাহ করা হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা এখানে অনায়াসে বসে সিগারেটসহ বিভিন্ন তামাকজাত দ্রব্য সেবন করছেন এবং কোম্পানির প্রমোশনাল উপহার গ্রহণ করছেন। ই-সিগারেট ও ভ্যাপের মতো নতুন প্রজন্মের নিকোটিন পণ্যের ব্যবহারও এসব জায়গায় দৃশ্যমান।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও অন্যান্য সংস্থার অভিযানে দেখা গেছে, কিছু ই-সিগারেটে মাদকদ্রব্য মিশিয়ে বিক্রি ও ব্যবহারের ঘটনা ঘটছে, যা তরুণ শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল রোড এলাকায় একাধিক জায়গায় পুরো দোকান ডেকোরেশন ও কালার ব্রান্ড করে তামাক গ্রহণের পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। নর্দান ইউনিভার্সিটি অব বিজনেজ এন্ড টেকনোলজি, খুলনা ক্যাম্পাস ও আশেপাশের মেইন রোডেও একই ধরনের বিজ্ঞাপন ও আকর্ষণীয় সাজসজ্জা দেখা যাচ্ছে, যা শিক্ষার্থীদের ধূমপান ও তামাক ব্যবহারে উৎসাহিত করছে।
বাংলাদেশের ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০০৫ (সাম্প্রতিক ২০২৫ সংশোধন) অনুসারে তামাকজাত দ্রব্যের সকল ধরনের বিজ্ঞাপন, প্রমোশন ও স্পনসরশিপ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ২০২৫ সালের সংশোধিত আইনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ক্লিনিক ও খেলার মাঠের ১০০ মিটারের মধ্যে তামাকজাত দ্রব্যের বিক্রয়, ব্যবহার ও বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। লঙ্ঘন করলে জরিমানা (প্রথমবার ৫,০০০ টাকা পর্যন্ত, পুনরাবৃত্তিতে দ্বিগুণ) এবং ক্ষেত্রবিশেষে কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। পয়েন্ট অব সেলে (দোকানে) ব্র্যান্ড প্রমোশন, ফ্রি উপহার বিতরণ ও আকর্ষণীয় ডেকোরেশনও আইনের পরিপন্থী। আইন লঙ্ঘন করলে জরিমানা (প্রথমবার ৫,০০,০০০ টাকা পর্যন্ত ও ছয় মাসের কারাদন্ড, পুনরাবৃত্তিতে দ্বিগুণ)
বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় এ ধরনের পরোক্ষ বিজ্ঞাপন তরুণদের মধ্যে ধূমপানের সূচনা করছে এবং পরবর্তীতে মাদকাসক্তির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। ফলে অনেক শিক্ষার্থীর পড়াশোনা, স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ নষ্ট হচ্ছে। পরিবারগুলোও অর্থনৈতিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হচ্ছে। খুলনায় তামাক ব্যবহারের হার বৃদ্ধির প্রবণতা নিয়ে আগেও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।
জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেলের অধীনে গঠিত জেলা ও উপজেলা টাস্কফোর্স কমিটিগুলোর এসব বিষয়ে নিয়মিত নজরদারি ও অভিযান পরিচালনা করা উচিত। সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনেরও দায়িত্ব রয়েছে নিজেদের ক্যাম্পাস ও আশেপাশের ১০০ মিটার এলাকা তামাকমুক্ত রাখার জন্য স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। দোকান মালিকদের মধ্যে অনেকে আইন সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত নন বলে জানা যায়; তাই সচেতনতা বৃদ্ধি ও আইন প্রয়োগ উভয়ই জরুরি।
এ ধরনের প্রমোশনাল দোকান অবিলম্বে বন্ধ করা, বিজ্ঞাপন অপসারণ এবং আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, নর্দান ইউনিভার্সিটি অব বিজনেজ এন্ড টেকনোলজি, খুলনাসহ দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আশেপাশে তামাকমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা না গেলে তরুণ প্রজন্মের স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে পড়বে। সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, স্থানীয় সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কাম্য।
তামাক নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ সরকারের সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো প্রশংসনীয়। তবে আইনের বাস্তবায়ন ও মাঠপর্যায়ের নজরদারি আরও জোরদার না করলে লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে। শিক্ষার্থীদের সুস্থ ভবিষ্যৎ গড়তে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

লেখক: কাজী মোহাম্মদ হাসিবুল হক, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ কর্মী।

Share This News