উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে সুদূর আমেরিকা পাড়ি দিয়েছিলেন জামিল লিমন আর নাহিদা বৃষ্টি। দুজনেই ছিলেন মেধাবী, প্রাণবন্ত, পরিবারের আশার প্রদীপ। কিন্তু কে জানত, ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার (ইউএসএফ) ক্যাম্পাসে তাদের গবেষণার পথ এমন নৃশংসভাবে থেমে যাবে? রুমমেটের হাতেই শেষ হয়ে যাবে দুটি তরুণ প্রাণ?
গত শুক্রবার টাম্পার হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজের নিচে জামিল লিমনের খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধারের মধ্য দিয়ে শুরু হয় এক মর্মান্তিক অধ্যায়। আর নাহিদা বৃষ্টিকে এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি—যদিও তার পরিবার নিশ্চিত হয়েছে, তিনিও আর বেঁচে নেই। গ্রেফতার হওয়া খুনি হিশাম আবুগারবিয়েহর বাসা থেকে পাওয়া রক্তের নমুনায় বৃষ্টির ডিএনএ পাওয়া গেছে।
যে দুটি স্বপ্ন চিরকালের জন্য থেমে গেল
২৭ বছর বয়সী জামিল লিমন ২০২৪ সালের শরৎ থেকে ইউএসএফে ভূগোল, পরিবেশ বিজ্ঞান ও নীতি বিষয়ে পিএইচডি করছিলেন। বন্ধুরা তাকে চিনতেন একজন হাসিখুশি, সহজ-সরল মানুষ হিসেবে। সহপাঠী ওমর হোসেন বলেন, “জামিল ছিল একজন ‘চিল গাই’, সবসময় হাসিমুখে থাকত। আমরা গত বছরের শরতে এক প্রফেসরের ইমেইলের মাধ্যমে পরিচিত হয়েছিলাম, পরে হয়ে উঠেছিলাম সবচেয়ে ভালো বন্ধু।”
এই গ্রীষ্মে দেশে ফেরার পরিকল্পনা ছিল জামিলের। পরিবারের সবার সাথে দেখা হবে, হয়তো বৃষ্টিকে নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও করবেন। ছোট ভাই জুবায়ের আহমেদ বলেন, “জামিল বৃষ্টির কথা পরিবারকে বলেছিল, বিয়ের কথাও ভাবছিল।”
২৭ বছর বয়সী নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি ২০২৫ সালের শরৎ থেকে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পিএইচডি করছিলেন। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করা এই মেধাবী তরুণী ছিলেন প্রাণবন্ত, মিশুক এবং সবাইকে সাথে নেওয়ার মানসিকতার। ওমর হোসেন বলেন, “বৃষ্টি ছিল অসাধারণ একজন মানুষ, সবাইকে সাথে নিত, খুব বাইরে যেতে ভালোবাসত।”
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর তাকে স্মরণ করে বলেন, “বৃষ্টি ছিল একজন প্রতিভাবান ও সম্ভাবনাময় শিক্ষার্থী।”
যেভাবে ঘটল হত্যাকাণ্ড
১৬ এপ্রিল সকাল ৯টার দিকে জামিল লিমনকে শেষবার দেখা যায় তার টাম্পার বাসায়। বৃষ্টিকে দেখা গিয়েছিল সকাল ১০টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যাচারাল অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সেস বিল্ডিংয়ে। এরপর তারা যেন হাওয়ায় মিলিয়ে যান। পরিবার ও বন্ধুরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লে ১৭ এপ্রিল তাদের নিখোঁজ ঘোষণা করা হয়।
প্রায় এক সপ্তাহ ধরে চলে উৎকণ্ঠা, অপেক্ষা। বাংলাদেশে বসে পরিবার প্রতিটি খবরের জন্য অধীর হয়ে থাকে। আমেরিকায় বন্ধুরা খুঁজে বেড়ান। কিন্তু শুক্রবার সকালে যখন হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজে জামিলের ক্ষত-বিক্ষত মরদেহ পাওয়া যায়, তখন সব আশাই ভেঙে পড়ে।
হিলসবোরো কাউন্টি শেরিফ চাড ক্রোনিস্টার বলেন, “এটি একটি গভীরভাবে বিরক্তিকর মামলা যা আমাদের সম্প্রদায়কে নাড়িয়ে দিয়েছে।”
আদালতের নথি অনুযায়ী, জামিল লিমন মারা গেছেন “একাধিক ধারালো অস্ত্রের আঘাতে”। তার শরীরে পাওয়া ক্ষতচিহ্ন থেকে বোঝা যায়, কতটা নৃশংসভাবে তাকে হত্যা করা হয়েছে।
যে খুনিকে চিনতেন বন্ধু হিসেবে
২৬ বছর বয়সী হিশাম আবুগারবিয়েহ ছিলেন জামিলের রুমমেট। ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত তিনিও ইউএসএফে ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে পড়াশোনা করেছিলেন, যদিও গ্রেফতারের সময় তিনি আর ছাত্র ছিলেন না।
শুক্রবার সকালে তার পারিবারিক বাসায় ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের খবর পেয়ে পুলিশ যখন পৌঁছায়, তখন ঘটে এক নাটকীয় ঘটনা। হিশাম নিজেকে ঘরে অস্ত্রসহ বন্দি করে ফেলেন। পরিস্থিতি এতটাই উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে ওঠে যে সোয়াট (SWAT) টিম ডাকতে হয়। দীর্ঘ সময় ধরে পুলিশের সাথে স্ট্যান্ডঅফের পর শেষ পর্যন্ত তিনি আত্মসমর্পণ করেন।
প্রথমে তার বিরুদ্ধে আনা হয় মৃতদেহ অবৈধভাবে সরানো, মৃত্যুর খবর গোপন করা, প্রমাণ নষ্ট করা, মিথ্যা বন্দিত্ব এবং শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ। কিন্তু শনিবার, প্রসিকিউটররা আরও ভয়াবহ অভিযোগ আনেন—অস্ত্র দিয়ে পূর্বপরিকল্পিত প্রথম-স্তরের হত্যার দুটি গণনা।
শনিবার তাকে টাম্পার আদালতে হাজির করা হয়। জামিন ছাড়াই তাকে আটক রাখার আদেش দেওয়া হয়েছে। ২৮ এপ্রিল তার শুনানি নির্ধারিত রয়েছে।
এক অপরাধীর ভয়াবহ ইতিহাস
হিলসবোরো কাউন্টি আদালত ও শেরিফ অফিসের রেকর্ড ঘেঁটে বেরিয়ে এসেছে হিশামের অতীতের ভয়াবহ চিত্র। ২০২৩ সালের মে ও সেপ্টেম্বরে তার বিরুদ্ধে শারীরিক আঘাত এবং চুরির অভিযোগ আনা হয়েছিল।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, তার নিজের পরিবারই তার বিরুদ্ধে ‘পারিবারিক সুরক্ষা নিষেধাজ্ঞার’ আবেদন করেছিল। অর্থাৎ তার ঘরের মানুষেরাই তার সহিংসতা থেকে বাঁচতে আদালতের শরণাপন্ন হয়েছিলেন।
তদন্তকারীরা হিশামকে ‘সিরিয়াল অফেন্ডার’ বা ধারাবাহিক অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন—একজন মানুষ যার উগ্র মেজাজ এবং সহিংস প্রবণতা বারবার প্রকাশ পেয়েছে।
পরিবারের অসহনীয় যন্ত্রণা
জামিলের ছোট ভাই জুবায়ের আহমেদ সিএনএনকে বলেন, “অনুগ্রহ করে আমার প্রিয় ভাইয়ের জন্য প্রার্থনা করুন। এটা আমাদের জন্য ধ্বংসাত্মক।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা গভীর যন্ত্রণায় আছি। আমরা অসাড় হয়ে যাচ্ছি। যেকোনো কিছু সম্ভব। আমরা শুধু সত্যটা জানতে চাই, তাদের কী হয়েছে।”
বৃষ্টির ভাই জাহিদ হাসান প্রান্ত জানিয়েছেন, হিশামের বাসার ভেতর থেকে পাওয়া রক্তের নমুনার সাথে তার বোনের ডিএনএ মিলেছে। এই নিশ্চিতকরণ পরিবারের শেষ আশাটুকুও কেড়ে নিয়েছে।
ওমর হোসেন, যিনি জামিলের সবচেয়ে ভালো বন্ধু ছিলেন, বলেন, “এই অনুভূতি বর্ণনা করা যায় না। এটা সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত এবং চমকে দেওয়ার মতো। আমাদের হৃদয় ভেঙে গেছে।”
তিনি জামিলের পরিবারের সাথে যোগাযোগ রাখছেন দেহ বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করতে।
পরিবারের দাবি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব
রবিবার, জামিল ও বৃষ্টির পরিবার যৌথভাবে একটি বিবৃতি দিয়েছে, যেখানে তারা ইউএসএফ ও কর্তৃপক্ষের কাছে বেশ কয়েকটি দাবি তুলে ধরেছে:
১. সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা: পরিবার চায় আইনের অধীনে হিশামের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হোক এবং আইনি প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হোক। বিশ্ববিদ্যালয়কে আদালতের কার্যক্রম শেষ পর্যন্ত মনিটর করতে হবে এবং পরিবারকে প্রয়োজনীয় আইনি ও আর্থিক সহায়তা দিতে হবে।
২. ইসলামিক রীতি অনুসরণ: তারা চান জামিল ও বৃষ্টির (যখন তার মরদেহ পাওয়া যাবে) দেহ ইসলামিক রীতি ও জানাজার প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী সামলানো হোক।
৩. সম্পদ ফেরত: জামিল ও বৃষ্টির সব ব্যক্তিগত জিনিসপত্র যেমন ছিল ঠিক তেমনভাবেই বাংলাদেশে পরিবারের কাছে ফেরত পাঠাতে হবে। তাদের যেকোনো অবশিষ্ট ব্যাংক ব্যালেন্স, বৃত্তি বা বেতন পরিবারের কাছে স্থানান্তর করতে হবে।
৪. জনসাধারণের অনুদান: বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি তহবিল স্থাপন করতে হবে যেখানে জনসাধারণ দান করতে পারবে।
৫. স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ: ইউএসএফকে জামিল ও বৃষ্টির স্মৃতির সম্মান জানাতে এবং ভবিষ্যতে এমন ট্র্যাজেডি প্রতিরোধে সাহায্য করতে একটি স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করতে হবে।
পরিবারের বিবৃতিতে বলা হয়, “আমরা অনুরোধ করছি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করুক যে তাদের স্মৃতি মর্যাদা ও সম্মানের সাথে সংরক্ষণ করা হবে।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিক্রিয়া
ইউএসএফের প্রেসিডেন্ট মোয়েজ লিমায়েম শনিবার এক বিবৃতিতে বলেন, “ঘটনাটি ক্যাম্পাসের বাইরে ঘটেছে এবং আবুগারবিয়েহ একাকী কাজ করেছেন। বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রদায়ের নিরাপত্তার জন্য আর কোনো চলমান হুমকি নেই।”
তিনি আরও জানান, “আমাদের কর্মীরা শিক্ষার্থীদের প্রিয়জনদের সাথে যোগাযোগ রেখে সহায়তা প্রদান করবে। আমরা বাংলাদেশ দূতাবাস এবং কনসুলেট জেনারেলের প্রতিনিধিদের সাথেও যোগাযোগ রাখছি।”
বিশ্ববিদ্যালয় নিশ্চিত করেছে যে জামিল ও বৃষ্টি উভয়েরই তাদের ছাত্রত্বের মাধ্যমে স্বাস্থ্য বীমা ছিল যার মধ্যে দেশে ফেরত পাঠানোর (রিপ্যাট্রিয়েশন) কভারেজ রয়েছে। বিমা কোম্পানির নির্দেশনা অনুসরণ করে প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে।
এক সম্প্রদায়ের শোক
এই দুর্ঘটনা শুধু দুটি পরিবার নয়, পুরো বাংলাদেশি সম্প্রদায়কে শোকে ভারাক্রান্ত করেছে। বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রেস মিনিস্টার গোলাম মোর্তোজা ফেসবুকে লিখেছেন, “ঘটনাটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক।”
বাংলাদেশ দূতাবাস ওয়াশিংটন ডিসিতে নিয়মিত যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট এবং এফবিআইয়ের সাথে যোগাযোগ রাখছে। মিয়ামিতে বাংলাদেশ কনসুলেট বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় তদন্তকারীদের সাথে সমন্বয় করছে এবং একজন প্রতিনিধি ক্যাম্পাস পরিদর্শন করেছেন।
নাহিদা বৃষ্টির খোঁজ এখনো চলছে
যদিও পরিবার নিশ্চিত হয়েছে বৃষ্টিও মারা গেছেন, তার মরদেহ এখনো খুঁজে পাওয়া যায়নি। হিলসবোরো কাউন্টি শেরিফ অফিস জানিয়েছে, বৃষ্টির খোঁজ অব্যাহত রয়েছে এবং যেকোনো তথ্যের জন্য তারা জনগণকে ৮১৩-২৪৭-৮২০০ নম্বরে যোগাযোগ করার অনুরোধ জানিয়েছে।
শেষ কথা
বিদেশের মাটিতে জ্ঞানার্জনের স্বপ্ন দেখা দুটি তরুণ প্রাণ এভাবে ঝরে যাওয়া শুধু তাদের পরিবারের জন্যই নয়, পুরো বাংলাদেশের জন্য এক গভীর ক্ষত। জামিল ও বৃষ্টির ভবিষ্যৎ ছিল উজ্জ্বল—একজন পরিবেশ বিজ্ঞানী, আরেকজন কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হয়ে দেশের জন্য কাজ করার স্বপ্ন দেখতেন তারা।
কিন্তু এক সহিংস মানুষের নৃশংসতায় সেই স্বপ্ন চিরতরে থেমে গেল। এখন শুধু ন্যায়বিচারের অপেক্ষা—যেন তাদের আত্মা শান্তি পায়, পরিবার কিছুটা সান্ত্বনা পায়।
জামিল লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির আত্মার শান্তি কামনা করছি।
সূত্র: সিএনএন, সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট, ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডা,