তাপদাহ মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান


বাংলাদেশে বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তন প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে রূপ নিয়েছে। তাপদাহ এখন আর কেবল একটি আবহাওয়াজনিত ঘটনা নয়, বরং সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং স্বাস্থ্যগত চ্যালেঞ্জ। তাপদাহ বৃদ্ধির মতো এই প্রাকৃতিক বিপর্যয় অনেকটাই মনুষ্যসৃষ্ট। পরিবেশ সংরক্ষণে স্বল্প-মধ্য-দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন এবং নাগরিক আচরণের পরিবর্তন জরুরি। আমরা যদি এখনই তীব্র এই তাপদাহ থেকে পরিত্রাণে কার্যকর পদক্ষেপ না নেই তবে এর ভয়াবহ প্রভাব মৃত্যু ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই একটি স্বাস্থ্যসম্মত, নিরাপদ ও বাসযোগ্য নগরী করে তুলতে ব্যক্তি, সমাজ এবং রাষ্ট্রসহ সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।
আজ ২৬ এপ্রিল ২০২৬, রবিবার, সকাল ১১.০০ টায় আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি- বাংলাদেশ এবং ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্ট কর্তৃক যৌথভাবে আয়োজিত “তাপদাহ ও জনস্বাস্থ্য: সচেতনতা, সুরক্ষা ও প্রতিরোধ” শীর্ষক ভার্চুয়াল আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
ওয়ার্ক ফর এ বেটার বাংলাদেশ ট্রাস্ট এর কমিউনিকেশন অফিসার শানজিদা আক্তারের সঞ্চালনায় এবং সংস্থার পরিচালক গাউস পিয়ারীর সভাপতিত্বে সভায় সম্মানিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি- বাংলাদেশ এর পাবলিক হেলথ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. মুহাম্মাদ ওয়াসিফুল আলম (পিএইচডি)। সভায় আরো বক্তব্য রাখেন, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্সেস এর শিক্ষার্থী মাশরাফী সুলতানা সীমু, ফার্স্ট ক্যাপিটাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এর শিক্ষার্থী মোঃ ইসমাইল শেখ, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশ এর শিক্ষার্থী এশা সানজিদা, আন্তর্জাতিক ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম এর শিক্ষার্থী জোবায়ের বিন হোসাইন।
বক্তারা বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অসহনীয় তাপদাহ (Heatwave) জনজীবনে স্বাস্থ্যগত ও পরিবেশগত সংকট তৈরি করছে। গ্রামাঞ্চলের চেয়ে শহরাঞ্চলে তাপদাহের প্রভাব সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান। গবেষণা অনুযায়ী, ঢাকা শহরের মতো বড় নগরীতে প্রায় ১.২৫ কোটি মানুষ, বিশেষত শিশু, বৃদ্ধ ও শ্রমজীবী মানুষ সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে। নগরায়নের নামে নির্বিচারে গাছ কাটার ফলে এক ধরনের “নীরব বিপর্যয়” ডেকে আনছে। পাশাপাশি অতিরিক্ত কংক্রিটের দালান নির্মাণ, খোলা জায়গার অভাব এবং যানবাহনের ধোঁয়া নির্গমন, পরিবেশ দূষণ, অতিরিক্ত জীবাশ্ম জ্বালানীর ব্যবহার, গ্রিনহাউস গ্যাস ইফেক্ট মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করছে।
তারা আরো বলেন, বাংলাদেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর অতিরিক্ত খাদ্য চাহিদা পূরণে অতিরিক্ত রাসায়নিক সারের ব্যবহার ক্ষতিগ্রস্থ করছে পরিবেশকে। রাসায়নিক সার উৎপাদন এবং ফসলের জমিতে এর প্রয়োগ—উভয় ক্ষেত্রেই নির্গত শক্তিশালী গ্রিনহাউজ গ্যাস পরিবেশকে উষ্ণ করে তোলে। পর্যাপ্ত জলাধারের সংকট এবং তীব্র তাপ প্রবাহে পানির স্তর নীচে চলে যাচ্ছে যার ফলে তীব্র পানির সংকট দেখা দিচ্ছে। তাপদাহের কারণে বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যা, যেমন- পানিশূন্যতা, হিট স্ট্রোক, তীব্র মাথাব্যথা, ক্লান্তি, হিট ক্র্যাম্পস, কিডনি ও ফুসফুসের জটিলতা, শ্বাসকষ্ট এবং হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি, উদ্বেগ-হতাশার মতো শারীরিক ও মানসিক সমস্যা বাড়ছে। অতিরিক্ত গরমের কারণে শ্রমজীবি জনগোষ্ঠীর কর্মক্ষমতা কমে যাচ্ছে, উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাচ্ছে যা দেশের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
সভা থেকে পরিস্থিতি মোকাবেলায় শহরে প্রচুর বৃক্ষরোপণ এবং পর্যাপ্ত ছায়ার ব্যবস্থা রাখা, পার্ক ও খোলা জায়গা সংরক্ষণ করা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাদবাগান চালু করা, হেঁটে ও সাইকেলে যাতায়াত, স্বাস্থ্যসম্মত ক্যান্টিন স্থাপন করা, বৈশ্বিক পরিবর্তনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে পরিবেশ বান্ধব অবকাঠামো তৈরি, পানির সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, এবং জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে যুগোপযোগী শিক্ষা-গবেষণা ও তাপদাহ সম্পর্কিত সতর্কতা এবং স্বাস্থ্য সচেতনতায় প্রচার-প্রচারণা বাড়ানো, পরিবেশবান্ধব নগর পরিকল্পনা গ্রহণ ও এক্ষেত্রে পরিবেশবিদ, স্থপতি, নগরপরিকল্পনাবিদ ও কমিউনিটির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং পৃথিবীকে বাসযোগ্য রাখতে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়।

Share This News