এখন ফাঁকা রাস্তায় চলতে ভয় লাগে এই নগরীতে

এক সময়ের ছিমছাম, কোলাহলমুক্ত আর শান্ত শহর হিসেবে খুলনার বেশ সুনাম ছিল। রূপসা পাড়ের এই শহরটিতে রাতের বেলা কিংবা ভর দুপুরে নির্জন রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে কখনো বুক কেঁপে উঠত না। বরং রাতের খাওয়া শেষে শহরের রাস্তায় একটু হেঁটে আসাটা অনেকের জন্যই ছিল এক প্রশান্তির অভ্যাস। কিন্তু সেই চিরচেনা খুলনা যেন ধীরে ধীরে তার রূপ বদলাচ্ছে। এখন ফাঁকা রাস্তায় চলতে গেলে অদ্ভুত এক অজানা ভয় এসে ভর করে।

আজকাল শিববাড়ি মোড়, সোনাডাঙ্গা, নিরালা কিংবা খালিশপুরের দিকে একটু রাত করে ফিরলে, অথবা দুপুরের শুনশান নীরবতায় একা হাঁটলে মনের ভেতর একটা শঙ্কা কাজ করে। পেছন থেকে আসা কোনো মোটরসাইকেলের শব্দ শুনলেই শরীর ছমছম করে ওঠে, মনে হয় এই বুঝি কেউ টান মেরে নিয়ে গেল হাতের ব্যাগটা বা পকেটের মোবাইল ফোনটা। শুধু আবেগের বশবর্তী হয়ে নয়, বরং সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান ও পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির দিকে তাকালেও এই ভয়ের বাস্তব ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায়।

বিশ্লেষকের দৃষ্টিকোণ থেকে এর পেছনে মূলত কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণ ও তথ্য অত্যন্ত স্পষ্ট:

কিশোর গ্যাং এবং মাদকাসক্তির ভয়াবহতা: শহরের অলিগলিতে এখন উঠতি বয়সীদের বেপরোয়া আড্ডা। স্থানীয় সূত্র ও সাম্প্রতিক সময়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, মহানগরীর খালিশপুর, সোনাডাঙ্গা, গল্লামারী বা টুটপাড়া এলাকায় কিছু সংঘবদ্ধ কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে। কেএমপির নিয়মিত মাদকবিরোধী অভিযানে প্রায় প্রতিদিনই বিপুল পরিমাণ মাদকসহ অপরাধীরা গ্রেফতার হচ্ছে, যা প্রমাণ করে এই শহরে মাদকের বিস্তার কতটা গভীরে পৌঁছেছে। এই তরুণদের অনেকেই মাদকের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে ছিনতাইয়ের মতো অপরাধে জড়াচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, ছিনতাই ও চুরির ঘটনা বৃদ্ধি: ফাঁকা রাস্তা পেলেই দুর্বৃত্তরা সাধারণ পথচারীদের টার্গেট করছে। পুলিশের মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভাগুলোর (Crime Conference) আলোচনার দিকে লক্ষ্য করলে বোঝা যায়, ছিঁচকে চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিয়মিত বেগ পেতে হচ্ছে। সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হলো, অনেক ভুক্তভোগী মোবাইল বা ব্যাগ হারানোর পর আইনি ঝামেলার ভয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) বা মামলা করতে চান না। ফলে অপরাধ বিশ্লেষকদের ধারণা, বাস্তবে ছিনতাইয়ের প্রকৃত পরিসংখ্যান সরকারিভাবে নথিবদ্ধ হিসাবের চেয়েও অনেক বেশি।

তৃতীয়ত, অপর্যাপ্ত সড়কবাতি ও অবকাঠামোগত সংকট : খুলনা সিটি কর্পোরেশনের অনেক এলাকাতেই এখনো রাতের বেলায় পর্যাপ্ত আলোর অভাব রয়েছে। প্রধান সড়কগুলো আলোকিত থাকলেও, একটু ভেতরের দিকের রাস্তা বা সংযোগ সড়কগুলোতে সন্ধ্যার পর ভুতুড়ে পরিবেশ তৈরি হয়। অন্ধকার থাকলেই সেখানে অপরাধীদের আনাগোনা বাড়ে।

শহর মানে তো শুধু কিছু উঁচু দালান বা চওড়া রাস্তা নয়; শহর মানে হলো নাগরিকদের নিরাপদ আশ্রয়। একজন নাগরিক যখন তার নিজের শহরের রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তখন তা পুরো সমাজ কাঠামোর একটি বড় ব্যর্থতাকেই আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরও অনেক বেশি প্রো-অ্যাকটিভ বা সক্রিয় হতে হবে। শুধু ঘটনার পর ব্যবস্থা নেওয়া বা মামলা রেকর্ড করা নয়, বরং ঘটনা যেন ঘটতে না পারে সেজন্য রাতের টহল (Night Patrol) বাড়ানো এবং কমিউনিটি পুলিশিং জোরদার করা প্রয়োজন। পাশাপাশি, সিটি কর্পোরেশনকে নিশ্চিত করতে হবে যেন শহরের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ সড়কগুলো রাতের বেলা অন্ধকারে ডুবে না থাকে।

খুলনা বরাবরই শান্তির নগরী। আমরা চাই না গুটিকয়েক অপরাধী আর অব্যবস্থাপনার কারণে আমাদের এই প্রিয় শহরের গায়ে ‘অনিরাপদ’ তকমা লেগে যাক। আমরা চাই ভয়হীন, নিরাপদ এক খুলনা, যেখানে যেকোনো সময় বুক ভরে নিঃশ্বাস নেওয়া যায়, যেখানে ফাঁকা রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে বারবার পেছনের দিকে তাকাতে হয় না।

লেখক : সাকিব

Share This News