খুলনায় ডেঙ্গুর ভয়াবহ প্রকোপ: শয্যা সংকটে হাসপাতালের মেঝে ও বারান্দায় চিকিৎসা নিচ্ছেন রোগীরা

খুলনা প্রতিনিধি: খুলনায় ডেঙ্গু পরিস্থিতির চরম অবনতি হয়েছে। ডেঙ্গু রোগীর অস্বাভাবিক চাপে হাসপাতালগুলোতে তিল ধারণের ঠাঁই নেই। শয্যা না পেয়ে বাধ্য হয়ে হাসপাতালের বারান্দা, মেঝে ও করিডোরে মশারি টাঙিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন রোগীরা। আবার অনেকেই একাধিক হাসপাতালে ঘুরেও ভর্তি হতে না পেরে বাড়িতেই চিকিৎসা নিতে বাধ্য হচ্ছেন।

খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতাল, খুলনা সদর হাসপাতাল এবং খুলনা স্পেশালাইজড হাসপাতালসহ বিভিন্ন চিকিৎসা কেন্দ্রে একই চিত্র। খুমেক হাসপাতালে ৫০০ শয্যার বিপরীতে বর্তমানে ১ হাজার ৯২০ জন রোগী চিকিৎসাধীন। এর মধ্যে ২১৫ জন ডেঙ্গু রোগী, অথচ সেখানে ডেঙ্গুর জন্য বরাদ্দ রয়েছে মাত্র ৭০টি শয্যা।

খুলনা শহরের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কেশব লাল রোডের শিক্ষার্থী সৃজন কুণ্ডু ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার পর ৭টি হাসপাতালে ঘুরেও কোনো শয্যা পাননি। বাধ্য হয়ে চিকিৎসকের পরামর্শে তাকে বাড়িতেই চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। তার মা লিপিকা কুণ্ডু জানান, হাসপাতালে থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের দেখা পাওয়া যায় এবং নজরদারি সহজ হয়। বাড়িতে নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা করানো কঠিন হলেও শয্যা না পাওয়ায় তাদের কোনো উপায় ছিল না। সৃজনের পরিবারের আরও তিনজন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। তার দাদা কানু কুণ্ডু জানান, একসঙ্গে কয়েকজনের চিকিৎসা, ওষুধ ও পুষ্টিকর খাবার জোগাড় করতে গিয়ে তারা আর্থিকভাবে চরম চাপের মুখে পড়েছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) তথ্য অনুযায়ী, আজ সকাল ৮টা পর্যন্ত পূর্ববর্তী ২৪ ঘণ্টায় খুলনা বিভাগে ৩১৬ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। চলতি বছর এই বিভাগে মোট ১১ হাজার ৩৪৯ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন, যাদের মধ্যে মারা গেছেন ৩৬ জন। বর্তমানে খুলনা বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে ১ হাজার ৯৩ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

গত ২৪ ঘণ্টায় খুলনা জেলায় সবচেয়ে বেশি ১১৭ জন নতুন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে কেবল খুমেক হাসপাতালেই ভর্তি হয়েছেন ৫২ জন। এছাড়া বাগেরহাটে ৩৯, যশোরে ৩৫, সাতক্ষীরায় ২০, ঝিনাইদহে ১১, কুষ্টিয়ায় ১০, নড়াইলে ৯, চুয়াডাঙ্গায় ৮ এবং মেহেরপুরে ৬ জন নতুন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।

খুমেক হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. সুজাত আহমেদ বলেন, “ডেঙ্গু রোগীদের পর্যাপ্ত বিশ্রাম, তরল খাবার ও নিবিড় পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন। কিন্তু প্রচণ্ড গরমের মধ্যে হাসপাতালের করিডোর ও বারান্দায় চিকিৎসা দেওয়ায় রোগীদের আরামদায়ক পরিবেশ ও নিভৃতবাস নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।”

পরিস্থিতি মোকাবিলায় খুলনা সিটি কর্পোরেশন (কেসিসি) মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার করেছে। গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে কেসিসির ৩১টি ওয়ার্ডে এডিস মশার লার্ভা ধ্বংস করতে ১৫৫ জন অতিরিক্ত কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। মশক নিধন ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের জন্য প্রায় ৩৩.১৩ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।

কেসিসির প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু জানান, ডেঙ্গু সংক্রমণের হার অনুযায়ী শহরকে রেড, অরেঞ্জ এবং ইয়েলো জোনে ভাগ করা হয়েছে। মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে এবং কারও বাড়ির আঙিনায় এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেলে জরিমানা ও সতর্ক করা হচ্ছে।

তবে সিটি কর্পোরেশনের এসব উদ্যোগের পরও ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে, আর কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা পেতে পদে পদে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।

Share This News