এক সময়ের খরস্রোতা শৈলমারী নদী দিয়ে দাপিয়ে বেড়াত বড় বড় লঞ্চ আর কার্গো। আর আজ? নদীটি যেন ধু ধু সমতল মাঠ, গরু চরানোর জায়গা! পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়া এই নদীর বুকে এখন চলছে অবৈধ দখলের মহোৎসব। শৈলমারী নদীর এই করুণ দশায় এবং খনন কাজের ধীর গতির কারণে আবারও দীর্ঘমেয়াদী জলাবদ্ধতার আতঙ্কে দিন পার করছেন বিলডাকাতিয়া এবং ডুমুরিয়া উপজেলার উত্তরাঞ্চলীয় এলাকার মানুষজন।
যেভাবে হারিয়ে যাচ্ছে শৈলমারী শিবসা নদী হয়ে সাগর থেকে আসা লবণাক্ত পলি জমতে জমতে শৈলমারী নদী আজ অস্তিত্ব হারাতে বসেছে। অথচ এই নদীটিই বিলডাকাতিয়া, ডুমুরিয়া, বটিয়াঘাটা ও খুলনা সিটি কর্পোরেশনের বিশাল একটি অংশের পানি নিষ্কাশনের প্রধান মাধ্যম। ২০১৯ সালে উচ্চ আদালত দেশের সব নদীকে ‘জীবন্ত সত্তা’ ঘোষণা করলেও, শৈলমারীর ক্ষেত্রে তা যেন শুধুই কাগুজে বুলি। বদনাখালী স্লুইস গেটের সামনে গেলে দেখা যায় নদীর মৃতপ্রায় অবস্থা। আর এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বটিয়াঘাটা ব্রিজ থেকে সালতা নদীর স্লুইস গেট পর্যন্ত প্রায় ৮ কিলোমিটার অংশ জুড়ে ঘেরের বেড়িবাঁধসহ গড়ে উঠেছে একের পর এক অবৈধ স্থাপনা।
জলাবদ্ধতায় কৃষকের কান্না নদীর নাব্যতা না থাকায় প্রতি বছর অন্তত ছয় মাস পানিবন্দি থাকতে বাধ্য হন এই এলাকার মানুষ। বিকল্প হিসেবে গত দু’বছর ময়ূর নদকে ব্যবহার করা হলেও তেমন কোনো সুফল মেলেনি। ফলে প্রতি বছর শত কোটি টাকার কৃষিজ ফসল তলিয়ে যায় পানির নিচে। কর্মহীন হয়ে পড়া কৃষিজীবী মানুষগুলোর অসহায়ত্বের যেন কোনো সীমা থাকে না।
পানি নিষ্কাশনের জন্য গত তিন বছর ধরে পানি উন্নয়ন বোর্ড লাখ লাখ টাকা খরচ করে রেগুলেটরের মুখের পলি অপসারণ করেছে, গত বছর বসানো হয়েছিল দুটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন সাবমারসিবল পাম্প। এত কিছুর পরও বিলডাকাতিয়া, রংপুর, সাড়াতলা, গুটুদিয়া, মির্জাপুরসহ প্রায় ৩০টি গ্রামের মানুষকে দীর্ঘ ছয় মাস পানির নিচেই কাটাতে হয়েছে।
রংপুরের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান সৌমিত্র বিশ্বাসের কথায় এলাকার মানুষের সেই অসহায়ত্বই ফুটে ওঠে। তিনি বলেন, “গত বছরের পানিতে এখনো ঘেরের বেড়ি তলিয়ে আছে। দীর্ঘ সময়ে এক ফোঁটা পানিও কমেনি। ময়ূর নদ দিয়ে বিকল্প ব্যবস্থা করা যেতে পারে, তবে স্থায়ী সমাধানের জন্য মেগা প্রকল্প দরকার।”
উন্নয়ন প্রকল্প বনাম বাস্তব চিত্র শৈলমারী নদী খননের জন্য ৪৯ কোটি টাকার একটি প্রকল্প পাস হয়েছে ঠিকই, কিন্তু মাঠ পর্যায়ে তার কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেই। অন্যদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ড, বিএডিসি ও ত্রাণ অধিদপ্তরের উদ্যোগে বিভিন্ন বিলে ছোট-বড় ডজনখানেক খাল খননের কাজ চলছে।
এ বিষয়ে রঘুনাথপুর ইউপি চেয়ারম্যান মনোজিত বালা বলেন, “সরকার খাল খনন শুরু করেছে ঠিকই, কিন্তু বিলডাকাতিয়ার পানি বের হওয়ার মূল পথ শৈলমারী নদীই যদি সমতল থাকে, তবে এই জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তির কোনো উপায় নেই।”
কর্তৃপক্ষের আশ্বাস এত হতাশার মাঝেও আশার কথা শুনিয়েছেন পানি উন্নয়ন বোর্ড খুলনার প্রধান তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আব্দুল মোমিন। তিনি জানান, “শিগগিরই শৈলমারী নদীর খনন কাজ শুরু হবে, ঠিকাদার নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। প্রথমে স্লুইস গেট থেকে শরাফপুরের দিকে খনন ও ড্রেজিং করা হবে। সেই সাথে এই প্রকল্পের আওতায় ৫টি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন পাম্প বসানো হবে। জার্মানির সাথে চুক্তি হয়ে গেছে, আগামী আগস্ট বা সেপ্টেম্বরের মধ্যেই পাম্পগুলো চলে আসবে।”
ভুক্তভোগী মানুষের এখন একটাই চাওয়া—কাগজের প্রতিশ্রুতিগুলো যেন দ্রুত বাস্তবে রূপ নেয়, আর বছর বছর পানিতে ডুবে থাকার এই অভিশাপ থেকে তারা যেন চিরতরে মুক্তি পান